প্রযুক্তির অপব্যবহার বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়

0
660

পৃথিবীতে সবকিছুর ভালো যেমন আছে, ঠিক তেমনি তার উল্টো দিকে খারাপটাও নিহিত । তেমনি আবিষ্কারের প্রতিটি জিনিসেরই রয়েছে দুটি দিক । ভালো ও খারাপ । বর্তমান পৃথিবীতে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এতটাই জনপ্রিয়তা লাভ করেছে যে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা চাইলে যে কোনো কিছুকে মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে দিতে পারে । একজন সহজ-সরল মানুষের জীবনও নষ্ট করে দিতে পারে। ইন্টারনেট অপব্যবহারের মধ্য দিয়ে শিশুরা নিজেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ জীবনকে ঝুঁকি ও ক্ষতির মুখে কীভাবে ঠেলে দিচ্ছে, তা নিয়ে আশঙ্কার শেষ নেই যেন। ১১ থেকে ১৪ বছরের যেসব ছেলেমেয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে, তাদের মধ্যে ৬০ শতাংশই এমন সব তথ্য ও চিত্র নিজেদের মধ্যে আদান-প্রদান করছে; যা তাদের ক্ষতির মুখে ফেলছে। এ ধরনের অর্ধেক শিশু এমন সব ছবি ইন্টারনেটে দেখছে এবং তা যে তাদের মানসিকভাবে আহত করেছে, তা স্বীকারও করেছে। ১৮ থেকে ২১ বছর বয়সী ছেলেমেয়ে যারা ইন্টারনেট প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে তারা স্বীকার করছে যে, হয় তারা নিজেরা এ ধরনের তথ্য বা চিত্র ইন্টারনেটে দেখতে পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বা অন্যকে ক্ষতির মুখে পড়তে দেখছে। ইন্টারনেটের ব্যাপক জনপ্রিয়তায় শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ কম্পিউটার নিয়ে বেশিরভাগ সময় কাটায়। কম্পিউটার ও ইন্টারনেট এখন মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্টারনেটে কী আছে ? সে প্রশ্নের উত্তরের চেয়ে কী নেই, তার উত্তর দেওয়া সহজ। ইন্টারনেটকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা এখন প্রায় অসম্ভব। সংবাদ, তথ্য, যোগাযোগ, কেনাকাটা, ব্যবসা-বাণিজ্য, সোশ্যাল নেটওয়ার্ক, বিনোদন প্রভৃতির জন্য মানুষ এখন ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কেউ যদি ইন্টারনেটের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, এ কারণে যদি কারো স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হয় এবং সিগারেট, মদ ও ড্রাগের মতো ইন্টারনেটের প্রতি যদি কেউ আসক্ত হয়ে পড়ে, তখনই সমস্যা। আর তখনই সমস্যায় পড়তে হয় ব্যবহারকারীর বন্ধু, স্বজন, পরিবার ও সমাজকে।

প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের অগ্রগতি আমাদের সমাজের জন্য অপ্রয়োজনীয়। সভ্যতার উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তির অবদান অপূরণীয়। কিন্তু আমরা কি কখনো অনুধাবন করে দেখেছি যে, প্রযুক্তির অকল্যাণকর দিকগুলো আমাদের অবস্থান কোথায় নামিয়ে দিচ্ছে? অবশ্য এর জন্য আবিষ্কার ও আবিষ্কারক কোনোটিই অপরাধী নয়, অপরাধী হচ্ছি আমরা ব্যবহারকারীরা।

এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমান ইন্টারনেটের তথ্যভারের প্রায় ২৫ শতাংশই পর্নোগ্রাফি। বর্তমানে ইন্টারনেটে মোট ২০ কোটির অধিক ওয়েবসাইটের মধ্যে ৫ কোটি পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইট রয়েছে। শিশুদের নিয়ে তৈরি অশ্লীল ছবির ওয়েবসাইট রয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখের বেশি। ১০ লাখের বেশি শিশুর ছবি রয়েছে এসব সাইটে। ১০ লাখের মতো অপরাধী এসব অবৈধ ব্যবসায় যুক্ত। এই ভয়ঙ্কর থাবার বিস্তার থেকে আমাদের তরুণ সমাজের মুক্তি এখন রীতিমতো চ্যালেঞ্জ। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে খ্যাত ওয়েবসাইটগুলো দেশের তরুণ সমাজকে অন্ধকারের দিকেই ধাবিত করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ ওয়েবসাইট মাইস্পেস তরুণ সদস্যদের নিয়ে বিপাকে পড়েছে। এসব তরুণ মাইস্পেস ব্যবহারকারীর বেশিইভাগই অনিরাপদ যৌন কিংবা মাদকাসক্তের মতো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ প্রকাশ করছে। ইউনিভার্সিটি অব উইসকন মিনের গবেষক মিগ্যান মরিনো ২০০৭ সালের ১৮ বছরের ৫০০ তরুণ-তরুণীর মাইস্পেস অ্যাকাউন্টের প্রোফাইল বিশ্লেষণ করেছেন। এতে দেখা যায়, ৫৪ শতাংশ অ্যাকাউন্টধারীর প্রোফাইলে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের ইঙ্গিত রয়েছে। ৪১ শতাংশের প্রোফাইলে পাওয়া গেছে মাদক ও বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার-সংক্রান্ত তথ্য। ২৪ শতাংশের অ্যাকাউন্টে আছে যৌন আচরণের নজির ও ১৪ শতাংশের প্রোফাইলে সহিংস ঘটনায় জড়ানোর মতো তথ্য পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শিশু ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। গবেষক ড. দিমিত্রির মতে, যেসব তরুণ-তরুণীর মাইস্পেস অ্যাকাউন্ট আছে, তাদের অধিকাংশই এমন ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করে; যা সহজেই চোখে পড়ে। আপত্তিকর আচরণ প্রমাণিত হওয়ায় মাইস্পেস এ পর্যন্ত প্রায় ৯০ হাজার সদস্য অপসারণ করেছে ।

২০০৯ সালে ইউরোপে অনুষ্ঠিত তথ্য নিরাপত্তাবিষয়ক সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। ইতোমধ্যে এ রকম স্পর্শকাতর চোরাই তথ্য বিক্রির জন্য হাজারো ওয়েবসাইট গড়ে উঠেছে ইন্টারনেটে। এ ছাড়া ক্রেডিট কার্ডের তথ্য বিক্রি হচ্ছে অনেক কম দামে। মাত্র কয়েক ডলারে এসব কার্ডের গোপন তথ্য বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ২০০৯ সালের যুক্তরাজ্যের ব্যাংকের এক তথ্যবিবরণীতে দেখা যায় টেলিফোন, ই-মেইল, ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যে ক্ষতি হয়, তার মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ২৯০ কোটি ৫ লাখ পাউন্ডের সমান। এমনি অবস্থায় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে গবেষণার মাধ্যমে ইন্টারনেটে প্রতারণা,সাইবার অপরাধ থেকে পরিত্রাণে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এ নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলা অপরিহার্য। নতুবা সর্বনাশা এ খেলায় পুরো জাতিকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে। বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারতে ফেসবুক সাংবাদিকতা বেড়ে যাচ্ছে। যেখানে ভুল তথ্য শেয়ার করে মানুষকে শুধু শুধু হয়রানি করা হচ্ছে। নামে-বেনামে ফেসবুক খুলে যাচ্ছে। যেগুলোয় সব নোংরা ভাষায় তথ্য শেয়ার করা হচ্ছে। সুতরাং এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন থাকা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here